Read more »
প্রশ্ন:হিন্দু ধরমের ১০টি বৈশিষ্ট্য ও গ্রন্থগুলো লিখ
সূচনা: হিন্দুধর্ম একাধিক ধর্মীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গঠিত। এই
ধর্মের কোনো একক প্রতিষ্ঠাতা নেই। লৌহযুগীয় ভারতের ঐতিহাসিক বৈদিক ধর্মে এই
ধর্মের শিকড় নিবদ্ধ। হিন্দুধর্মকে বিশ্বের “প্রাচীনতম জীবিত ধর্মবিশ্বাস” মতবাদ আখ্যা দেওয়া হয়।
হিন্দু ধর্মের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো: হিন্দু ধর্মের প্রধান প্রধান
বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে
১.অবতারবাদে
বিশ্বাসঃ
হিন্দু ধর্ম অবতারবাদে বিশ্বাসী। অবতার অর্থ হলো অবতরণকারী।
হিন্দুশাস্ত্রের পরিভাষায় স্বর্গ থেকে ঈশ্বর মনোনীত যে মহাপুরুষগণ মানুষকে নীতি
শিক্ষাদানের জন্য মর্তে আগমন করেন তাঁদেরকে অবতার বলা হয়। সাধারণত জগৎ-জীবনকে
দিব্য প্রকৃতিতে উঠাবার এবং ধর্ম সংস্থাপন ও অধর্মের বিনাশের জন্য ঈশ্বরের পক্ষ
থেকে অবতারগণ আগমন করে থাকেন।
২.পরস্পর বিরোধী
বিশ্বাসের সহাবস্থান:
হিন্দু ধর্মে একাধিক দৃষ্টিভঙ্গির সহাবস্থান লক্ষ্য করা
যায়। হিন্দু ধর্ম বলতে কোন একটি বিশেষ ধরনের ধর্ম সম্বন্ধীয় অভিজ্ঞতাকে বুঝায়
না; বরং এ ধর্মে বিভিন্ন মনীষী ও
মাহপুরুষদের দ্বারা প্রাপ্ত ধর্ম সম্বন্ধীয় বিভিন্ন অভিজ্ঞতার একত্র সংযোগ লক্ষ্য
করা যায়। কাজেই এই ধর্মে পরস্পর বিরোধী বিশ্বাস লক্ষ্য করা যায়। এ ধর্ম পরস্পর বিরোধী
বিশ্বাসের সহাবস্থান সম্বলিত বৈচিত্র্যময় ধর্ম। এমন বিচিত্র ব্যাপার প্রচলিত
ধর্মসমূহের আর কোনটিতেও দেখা যায় না।
৩.জরা জীবন থেকে
মুক্তি লাভে বিশ্বাস:
হিন্দু ধর্মের
বিশ্বাস হল, কর্মের মাধ্যমে এবং জ্ঞানের মাধ্যমে জাগতিক
জরা জীবন থেকে মুক্তি লাভ করা যায়।
এ ধর্মের নীতি হলো,নিষ্কাম সাধনা,
অর্থাৎ কর্তব্যের খাতিরে মরে যাও তবুও ফলের আশা করো। এ ধর্ম বলে, কর্মের মাধ্যমে যে মুক্তি লাভ করা যায়।তা হলোস্বর্গলাভ।
এতে আরো মনে করা হয়, ঈশ্বরের করুণার মাধ্যমেও মুক্তি লাভ করা যায়।
৪.পুনর্জন্ম
মতবাদে বিশ্বাস:
হিন্দু ধর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পুনর্জন্মে বিশ্বাস।
পুনর্জন্মের অর্থ হলো জীবের মৃত্যুর পর আত্মা নতুন দেহ ধারণ করে পুনঃপুনঃ পৃথিবীতে
আগমন করবে। গীতায় বলা হয়েছে,
“মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র গ্রহণ
করে, আত্মাও তেমনি জীর্ণ দেহ ত্যাগ
করে অন্য নতুন দেহ গ্রহণ করবে।”
হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস হল পুনর্জন্মবাদ যা অদ্বৈতবাদের সাথে
গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রাচীন বৈদিক যুগে এর অস্তিত্ব ছিল না। তখন পর্যন্ত
হিন্দুদের ভিতর এই জড়-পার্থিব জীবন সম্পর্কে আশাবাদী দৃষ্টিকোণ ছিল। তারা বিশ্বাস
করত যে, মৃত্যুর পর তারা চিরকাল চালু
থাকবে। তাদের ধারনা ছিল এমন যে,
মৃত্যুর পর
তারা পূণ্য কাজের জন্য স্বর্গে প্রবেশ করবে আর মৃত্যুর পর তারা নরকে প্রবেশ করবে
যদি তারা ভাল কাজ সম্পন্ন না করে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের এই ধ্যান-ধারনা
পাল্টায় এবং তারা পুনর্জন্মবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠে।
৫.অদ্বৈতবাদ :
হিন্দুধর্মে আরাধ্যের আধিক্য তার অদ্বৈতবাদের সাথে গভীরভাবে
সম্পর্কযুক্ত। অদ্বৈতবাদ হল সকল দেব-দেবী ও সকল প্রাকৃতিক শক্তি যেমনঃ বায়ু, পানি,নদী,ভূমিকম্প,মহামারী ইত্যাদি এক একক প্রাণশক্তির বিভিন্নরুপ আছে।
৬.কর্মবাদে
বিশ্বাস:
কর্মবাদ অনুসারে মানুষকে অবশ্যই তার নিজ কর্মের ফল ভোগ করতে
হবে। যেমন- সৎকর্মের ফল পুণ্য বা সুখ এবং অসৎ কর্মের ফল পাপ ও দুঃখ।
৭.অধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাস:হিন্দু ধর্ম
আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী।
৮.ঈশ্বরের প্রতি
বিভিন্নধর্মী বিশ্বাস:
ঈশ্বরের আকার প্রসঙ্গে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এই ধর্ম বিভিন্ন
মতবাদ পোষণ করে। হিন্দুদের বড় তিনজন দেবতা হল ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব। এদের আওতাধীন রয়েছে আবার অসংখ্য
দেব-দেবী। তাদের বিশ্বাস হল এই যে, ব্রহ্মা হল বিশ্বজগতের স্রষ্টা, বিষ্ণু পালনকর্তা এবং শিব সংহারকর্তা। হিন্দুগণ
বিশ্বাস করে যে, বিশ্বজগৎ
সৃষ্টির পর থেকে ব্রহ্মার সাথে সৃষ্টির কোন সম্পর্ক নেই। তাই তারা শিব ও বিষ্ণুর
উপাসনা করে থাকে। তারা বিশ্বাস করে তারা একাধিক কেউ নয় বরং তারা সকলে একই
সত্ত্বার অধীনভূক্ত। তারা এভাবে করে একেশ্বরবাদের বিশ্বাসী। কিন্তু কেউ শিবের
প্রতি আবার কেউ বিষ্ণুর প্রতি অতি গুরুত্বারোপ করে থাকে। এভাবে করে তাদের ভিতর
নানা সম্প্রদায় তথা বৈষ্ণব,
ব্রাহ্মণ, শৈব্য, শাত্য ও গানপতা সম্প্রদায় লক্ষ্য করা যায়।
৯.বেদে অকুণ্ঠ
বিশ্বাস:
এ ধর্মের অনুসারীরা ঐশ্বীগ্রন্থরূপে বেদের অস্তিত্ব এবং
কর্তৃত্বে বিশ্বাস করে। তাছাড়া বর্তমানে হিন্দু ধর্ম তার পুরাণ তথা প্রাচীন
শাস্ত্রের উপর নির্ভরশীল। এগুলো হল প্রাচীন ধর্মলিপি। এগুলোতে বিশ্ব সৃষ্টির অনেক
কাহিনী লিপিবদ্ব আছে।
১০.ভিন্ন ধারার
একেশ্বরবাদ:
হিন্দু ধর্মে অসংখ্য দেবদেবীর অস্তিত্ব থকলেও মূলত একটি
একেশ্বরবাদী ধর্ম। এ ধর্ম এক পরম আধ্যাত্মিক সত্তায় বিশ্বাসী। এ ধর্ম মনে করে যে, পরম ঈশ্বর বহু ঈশ্বরের মাঝে নিজেকে প্রকাশ করেছেন।
কাজেই হিন্দু ধর্ম প্রচলিত সকল ধর্মে বিশ্বাসের বাইরে এক বিশেষ ধরনের একেশ্বরবাদে
বিশ্বাসী।
১১.বর্ণশ্রমে
বিশ্বাস:
এ ধর্মে বর্ণাশ্রমের ওপর বিশ্বাস রাখতে বলা হয়। যা হল
ব্রাহ্মন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শুদ্র। হিন্দুরা বিশ্বাস করে থাকে যে, ব্রাহ্মণরা স্রষ্টার মুখ থেকে, ক্ষত্রিয়রা স্রষ্টার বাহু থেকে, বৈশ্যরা উরু থেকে, শুদ্ররা স্রষ্টার পা থেকে সৃষ্টি। এখানে ব্রাক্ষণদের কাজ হল
ধর্মীয় দায়-দায়িত্ব বহন করবে,
ক্ষত্রিয়গণ
যুদ্ব পরিচালনা ও দেশ পরিচালনার কাজে নিয়োজিত থাকবে, বৈশ্যগণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি কার্য সম্পাদন করবে
এবং শুদ্রগণ উপরোক্ত তিন শ্রেণীর সম্প্রদায়ের সেবা-শুশ্রুষা করবে।
হিন্দু
ধর্মীয় গ্রন্থের নামঃ
বৈদিক
যুগের হিন্দু ঋষিগণ বেদকে ভিক্তি করে যুগপোযোগী কতকগুলি শাস্ত্র রচনা করেন। সেগুলো
হলঃ স্মৃতিসংহিতা, ইতিহাস, পুরাণ, আগম এবং ষড়-দর্শন।
এগুলি উল্লেখযোগ্য হিন্দুধর্ম গ্রন্থ বলে পরিচিত।
১.বেদঃ হিন্দুধর্মের
প্রসিদ্ধশাস্ত্র গ্রন্থ বেদ।বেদের
অপর নাম শ্রুতি।
বেদ চার প্রকার। যথা- ক) ঋক্বেদ, খ) সামবেদ, গ)যজুর্বেদ এবং ঘ) অথর্ববেদ।
ঋষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ বেদব্যাস এই বেদের বিভাগ কর্তা।
প্রত্যেক
বেদের দুটি অংশ তা হলঃ ক)সংহিতা (সংহিতায় আছে মন্ত্র) এবং খ)ব্রাহ্মণ (ব্রাহ্মণে
আছে তার অর্থ ও ব্যবহার)।
বেদাঙ্গঃ বেদের মর্ম
যথার্থভাবে উপলব্ধি করার জন্য বেদের ছয়খানা অবয়বগ্রন্থঅধ্যায়নের প্রয়োজন। এই
অবয়ব গ্রন্থগুলিকে বলা হয় বেদাঙ্গ।
বেদাঙ্গ শাস্ত্রগুলো হলঃ ক) শিক্ষা, খ) কল্প, গ)ব্যাকরণ, ঘ) নিরুক্ত, ঙ) ছন্দ এবং
চ)জ্যোতিষ।
২.উপবেদঃ মূল
বেদের সহকারী গ্রন্থ বলে এদেরকে উপবেদ বলে। যথাঃ- ক) আয়ুর্বেদ(ভেষজশাস্ত্র), খ) ধনুর্বেদ (অস্ত্রবিদ্যা), গ)গন্ধর্ববেদ (সঙ্গীত
বিদ্যা) এবং ঘ)স্থাপত্যবেদ (কৃষিবিদ্যা)
৩.উপনিষদঃ যে গ্রন্থপাঠে ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করা যায় তাকে উপনিষদ বলে।
উপনিষদ হল বেদের সারাংশ তাই একে বেদান্তও বলা হয়। উপনিষদের সংখ্যা অনেক।
বর্তমানে১১২ খানা উপনিষদের
নাম জানা গেছে।
৪.মহাভারত ও রামায়ণঃ মহাভারত ও রামায়ণ এ দুটি হিন্দুধর্মীয়
গ্রন্থের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই গ্রন্থ দুটি ইতিহাসে মহাকাব্য হিসাবে
পরিগণিত হয়ে রয়েছে। বেদের শাশ্বত সনাতন সত্যগুলি ঐতিহাসিক কথা-কাহিনীর মধ্য দিয়ে
জনসমাজে প্রচার করা এই ধর্মগ্রন্থ দুটির মুখ্য উদ্দেশ্য।
৫.শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাঃ মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত
সুপ্রসিদ্ধ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মহাভারতের অন্তর্গত হলেও স্বতন্ত্র ধর্মগ্রন্থরূপে
হিন্দু সমাজে সমাদৃত।চতুর্বেদের সার উপনিষদ, উপনিষদের সার এই গীতা ধর্মের
গুঢ়তত্ত্ব গীতায় প্রকাশিত। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ প্রাক্কালে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ
হিন্দুধর্মের সারতত্ত্ব তৃতীয় পান্ডব অর্জুনের কাছে ব্যাখ্যা করেন।
৬.পুরাণঃ যা
পুরাতন তাই পুরাণ।
বেদের পুরাতন দার্শনিকতত্ত্ব ও সাধনতত্ত্ব নানাভাবে উপাখ্যানের মাধ্যমে পুরাণ
প্রচার করেছে বলে একে পুরাণ বলা হয়। পুরাণকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
যথাঃ- ক) মহাপুরাণ এবং খ) উপপুরাণ।
৭.মহাপুরাণঃ হিন্দুশাস্ত্রে আঠারোটি মহাপুরাণ রয়েছে। এই
আঠারোটি পুরাণের মধ্যে সাতটি পুরাণ
উল্লেখযোগ্য।
৮.চন্ডিঃ চন্ডি
মার্কন্ডেয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত হলেও প্রকৃতি পক্ষে একটি স্বতন্ত্র হিন্দু
ধর্মগ্রন্থ রূপে স্বীকৃত। জগৎ জননী মা দুর্গার আগমনে অর্থাৎ দুর্গা পূজার সময় পাঠ
করা হয়। এছাড়াও গীতা মত চন্ডি হিন্দুদের নিত্য-পাঠ্য বিষয় আগম
শাস্ত্রঃ হিন্দুধর্মে
আগম শাস্ত্রের সংখ্যা অনেক।
উপসংহার:উপরোক্ত গ্রন্থগুলো ছাড়াও আরো অনেক গ্রন্থ উপগ্রন্থ রয়েছে।





0 Reviews