Read more »
ভূমিকাঃ দিল্লির সালতানাতের ইতিহাসে ইলতুৎমিশ একটি স্মরণীয় নাম।সুলতান কুতুবউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র আরাম শাহ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তার অযোগ্যতা অদক্ষতা বিচক্ষণতার অভাবে মাত্র 8 মাস এর বেশিদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি। এরপরে ক্ষমতায় আসেন ইলতুৎমিশ।ইলতুৎমিশ তার দক্ষতা ও বুদ্ধি সম্পন্ন প্রতিভা দিয়ে সাম্রাজ্যকে বিদ্রোহ মুক্ত করেন এবং নব নব রাজ্য জয় করে খ্যাতি লাভ করেন। উন্নত চরিত্র ও কৃতিত্ব ইলতুৎমিশকে দিল্লির সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি এনে দেয়।
সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ এর পরিচয়:
নাম ও প্রথমিক জিবন:
সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ তুর্কিস্তানের ইলবারী গোত্রের লোক ছিলেন।তাকে আলতামাশ,আলতুতমিশ কিংবা ইলতুতমিস ইত্যাদিও বলা হয়।পিতার নাম ইয়ালাম খান।তার ভাইয়রা তার মেধা ,মুদ্ধিমত্তা এবং জ্ঞানে ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে এক দাস ব্যবসায়ীর নিকট বিক্রয় করে দেন।ফলে ঐ ব্যবসায়ী ইলতুৎমিস কে কাযি পরিবারে বিক্রয় করে দেন।এরপর আবার কাযী পরিবার থেকে জালাল উদ্দিন নামক আর এক ব্যবসায়ী তাকে কুতুব উদ্দিন আইবেকের কাছে বিক্রয় করে দেন।ইলতুৎমিশ মুহাম্মদ ঘুরীকে প্রভূত সাহায্য করার কারণে পুরস্কার হিসাবে সুলতানের আদেশে কুতুবদ্দিন দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন।কুতুবুদ্দিন তার প্রতিভা দেখে নিজ কন্যাদে তার সাথে বিবাহ দেন।সুলতান কুতুব উদ্দিনের মৃত্যুর পর আরাম শাহ সিংহাসনে আরোহণপূর্বক অরাজকতা সৃষ্টি করলে আমীর ওমরাদের ্অনুরোধে ইলতুৎমিস আরাম শাহকে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন।
ইলতুৎমিশের সিংহাসনে আরোহনঃ
কুতুবউদ্দিন আইবেকের মৃত্যুর আারাম সাহের দুর্বলতার সুযোগে সমগ্র রাজ্যে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি র আমীর ওমরাহগণ বদাউনের শাসনকর্তা ইলতুৎমিশকে সিংহাসনে বসান।
ইলতুৎমিশের কৃতিত্বঃ
দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ইলতুৎমিশের কৃতিত্ব নিচে আলোচনা করা হলোঃ-
১.) আমির অভিজাত্যের দমনঃ সিংহাসনে বসে ইলতুৎমিস তাহার বিরোধী আমির ও অভিজাতদের দিল্লির নিকটবর্তী'জুদ' নামক স্থানে পরাজিত করেন। দিল্লির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ আধিপত্য স্থাপন করে এবং ওতার নিকটস্থ বদাউন অযোধ্যা বারাণসী প্রভৃতি অঞ্চল নিজের আয়ত্তে আনেন।
২.)তাজউদ্দীন ইয়ালযুদের সাথে সংঘর্ষঃ গজনীর শাসনকর্তা তাজউদ্দিনকে ১২১৫ সালে তরাইনের যুদ্ধে ইলতুৎমিশ পরাজিত করেন। পরে তাকে বন্ধি থাকা অবস্থায় হত্যাকরা হয়। পরবর্তী সময় ইয়ালদুজ বদাউনের কারাগারে বন্ধি অবস্থায় প্রাণ ত্যাগ করেন।।
৩.)নাসির উদ্দিন কুবাচার পরাজিতঃ ইলতুৎমিস ১২২৭ সালে বাক্কার দুর্গ আক্রমণ করলে প্রাণ ভয়ে নাসির উদ্দিন পালিয়ে যান। কিন্তু ১২২৮ সালে ইলতুৎমিস আবার তাকে আক্রমণ করলে নাসিরুদ্দিন কুবাচা পলায়নকালে সিন্ধু নদীতে ডুবে মারা যান।।
৪.) খলজি মালিকদের বাংলায় আগমনঃ বাংলায় খলজি মালিকগণ দিল্লির অধীনতা অস্বীকার করে। গিয়াসউদ্দিন খলজিও আলী মর্দান খলজী নিজের নামে মুদ্রা জারি করেন এবং খুৎবায় নিজের নাম উল্লেখ করেন। ইলতুৎমিশ ১২২৫ খ্রিস্টাব্দে গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলে তিনি যুদ্ধ ছাড়া আত্মসমর্পণ করেন। নাসির উদ্দিন আবার ১২২৭ খ্রিস্টাব্দে বিজয় হলে ইলতুৎমিস তদীয় পুত্র নাসির উদ্দিনকে তার বিরুদ্ধে পেরন করেন। যুদ্ধে গিয়েছিলেন পরাজিত ও নিহত হলে এই সুযোগে সুলতান পুত্র নাসির উদ্দিনকে বাংলার সিংহাসনে বসান।
৫.) রাজ্য বিজয়ঃ সুলতান ইলতুৎমিশের জৈষ্ঠ পুত্র নাসির উদ্দিন মাহমুদ ১২২৭ সালে বাংলাদেশে অভিযান চালান এবং গিয়াস উদ্দিন ই ওয়াস খলজিকে পরাজিত করে বাংলা কে দিল্লির পরিণত করেন। ১২২৭ সালে মন্দোল ও মিওয়াখিল,১২৩১ সালে গোয়ালিয়র, ১২৩৩ সালে ভিলসা ও উজ্জয়নি নগরি অধিকার করেন।
৬.)খলিফা স্বীকৃতিঃ ইলতুৎমিশের অন্যতম কৃতিত্ব হলো বাগদাদের খলিফা আল মুসতানসির বিল্লাহর কাছ থেকে ১২২৯ সালে,' সুলতান ই আজম' উপাদি পাপ্তি ও স্বীকৃতি।
৭.)আরবি মুদ্রার প্রচলনঃ সুলতান ইলতুৎমিশ সর্বপ্রথম খাঁটি আরবি মুদ্রার প্রচলন করেন। তার শাসনামলে প্রচলিত মুদ্রার নাম হল রুপাইয়া।তার প্রবর্তিত প্রতিটি টাকার ওজন ছিল ১৭৫ গ্রেন।বাগদাদের খলিফার নাম তিনি মুদ্রায় অংকন করেন।এমন কি নিজকে আমির বলে দাবি করেন।
৮.) দক্ষ সামরিক নেতাঃ সুলতান ইলতুৎমিশ কঠোর হাতে রাজ্যের বিশৃঙ্খলা দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সামরিক নেতা। যার ফলে তার শাসনামলে রাজ্যে কোন অভ্যন্তরিন বিদ্রোহ দেখা দেয়নি।
৯.) ধর্মভীরু মানুষঃ সুলতান ইলতুৎমিশ একজন ধর্মভীরু শাসক ছিলেন।তিনি আলেমদের খুব সমাদর করতেন।তার শাসনামলে অনেক পীর দরবেশ সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।
১০.) শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায়ঃ শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা হিসেবে সুলতান ইলতুৎমিশ বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। তিনি দিল্লিকে ইসলামি সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রে রুপান্তরিত করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। এছাড়া তিনি কুতুবউদ্দিন প্রতিষ্ঠিত, কুতুব মিনার, কুডয়াতুল ইসলাম মসজিদ এবং আড়াই দিনকা ঝোপড়া মসজিদ সংস্কার সাধন করেন।
১১.) শ্রেষ্ঠ শাসকঃ ইলতুৎমিশ ছিলেন একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী শাসক। সততা ও যোগ্যতা এবং দক্ষ নেতৃত্বের জন্য জনগণের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছেন।
১২.) উন্নত চরিত্রের অধিকারীঃ সুলতান ইলতুৎমিশ ছিলেন সৎ ন্যায়পরায়ন, দয়ালু,পরোপকারী, নিষ্ঠাবান, জনদরদদি প্রকৃতির শাসক।তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় আচাী অনুষ্ঠান পালন করতেন।
১৩.) উন্নয়নকামী শাসকঃ ইলতুৎমিশ উন্নয়নের পন্থা হিসেবে রাজনীতি কে বেচে নেন।তিনি রাজ্যে অনেক মসজিদ - মক্তব, সরাইখানা, রাস্তা নির্মাণ করেন।
১৪.) শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নঃ ইলতুৎমিশের শাসনামলে দিল্লিতে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয় এবং তুর্কি সাম্রাজ্য স্বর্ণ শিখরে আরহণ করেছিল।
১৫.) সুহৃদয়বান মানুষঃ উদারতা ও মহানুভবতা ইলতুৎমিশের চরিত্রে অন্যতম মহৎ গুণ। বিপদ মুসিবতের মধ্যে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে স্বীয় ভাগ্য নির্ধারণ করেন।
১৬.) চরিত্রেঃ ইলতুৎমিস ছিলেন নির্ভীক সুচতুর ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনীতিবিদ।তিনি আত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে নব প্রতিষ্ঠীত দিল্লির সালতানাতকে বহিঃ শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন।
১৭.) দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতাঃ কুতুবউদ্দিন মুসলিম সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করলেও ইলতুৎমিশ ছিলেন নিঃসন্দেহে এর প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।ইলতুৎমিশ তার বিচক্ষণতার ও সমর কৌশল দিয়ে সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
উপসংহারঃ উপযুক্ত আলোচনার পরিপেক্ষিতে বলা যায় যে,ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সুলতান ইলতুৎমিশ একজন দক্ষ শাসক ছিলেন। তিনি ছিলেন উন্নত চরিত্রে অধিকারী এবং ইসলামি আর্দশে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজ্য পরিচালনায় কৃতিত্ব স্থাপন করেন।সুতরাং সব দিক বিবেচনা করে ইলতুৎমিশ কে দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মূল্যায়ন করা ভূল হবে না।ভুল হবে না।
মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা




0 Reviews