Read more »
ভূমিকা: মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অরজকতাপূের্ণ ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। নিচে উভয়ের অবস্থা আলোচনা করা হলো
মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের সামাজিক অবস্থা:
১. জাতিভেদ প্রথা: মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে হিন্দুরা চারটি প্রধান জাতি বর্ণে বিভক্ত ছিল যথা: ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়,বৈশ্য ও শূদ্র।
২. শোষণ ও নির্যাতন: সমাজে বৈশ্য ও শূদ্ররা সবচেয়ে সবচেয়ে অসহায় নির্যাতিত নিষ্পেষিত সুবিধাবঞ্চিত লোক ছিল। ঋতুপর্ণের লোকেরা অধ্যায়ন করলে তাদের জিব্বা কেটে ফেলা হতো। এমনকি বিভিন্ন বর্ণের লোকদের মাঝে বিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল না।ব্রাহ্মণদের সাথে নিচের বর্ণ লোকদের সাথে বিয়ে হত না।
৩. ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় দের সুবিধা: হেবি বর্ণজাতি অধিক সুবিধাপ্রাপ্ত মান-সম্মানের জাতি ছিল। তাদের সুবিধার্থে অন্যান্য সম্প্রদায়কে তারা ব্যবহার করত। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, পৃথিবীর যেখানে যা আছে, তা ব্রাহ্মণদের সম্পত্তি বলে পরিগণিত হবে।
৪. নারীদের অবস্থান: নারীদের ভোগের পণ্য ছাড়া আর কিছুই ভাবা হতো না। বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধকরণ নারীদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল।পুরুষরা বহুবিবাহ করলেও নারীদের একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল।
৫. কুসংস্কার ও অনাচার:কুসংস্কার ও অনাচার সমাজ জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। আলবেরুনি কিতাবুল হিন্দ গ্রন্থের বলেন,সমাজে হিন্দু প্রাধান্য ও তাদের রীতিনীতি গুলো সমাজ ব্যবস্থাকে কলুষিত করে তুলেছিল।
৬. হিন্দু ধর্মের প্রাধান্য: তৎকালীন ভারত উপমহাদেশে প্রধানত বৌদ্ধ জৈন ও হিন্দু ধর্মের লোকেরা বাসা করত। হিন্দু ধর্মের প্রাধান্য ছিল সবচেয়ে বেশি কারণ অধিকাংশ রাজা ছিল হিন্দু ধর্মালম্বী।
৭. বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা অর্চনা: ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমনের কালে হিন্দুরা নিজেদের হাতে বহু মূর্তি নির্মাণ করেন এবং সেই মূর্তিগুলোকে তারা পূজা করতো।
মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা:
আরবদের সিন্ধু বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা কি রকম ছিল তা নিচে আলোচনা করা হলো।
১. ভারতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের উদ্ভব: আরবদের সিন্ধু বিজয়ের প্রাক্কালে উত্তর ভারতে কোন একক শক্তিশালী রাজ্য ছিল না। দশম শতকের শেষ দিকে গুর্জর প্রতিহার বংশের পতনের পর রাজপুত প্রধানগণ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
২. উপমহাদেশের পূর্ব ভারতে সেন ও পাল রাজ্য: আরবদের সিন্ধু বিজয়ের প্রাক্কালে উপমহাদেশের ভারতের পূর্ব দিকে সেনগণ বাংলায় এবং পালগণ বিহারে স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করেছিল। এই উভয় বংশের শাসনকাল দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।
৩.ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে তিনটি রাজ্যে বিভক্ত ছিল: ঐতিহাসিকদের তথ্যমতে আরবদের সিন্ধু বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম অঞ্চলে তিনটি সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্যে বিভক্ত ছিল। তা হল দক্ষিনে সিন্ধু রাজ্য, উত্তরে কাপিসি রাজ্য এবং দুটি রাজ্যের মধ্যবর্তী তাজাকুট ছিল।
৪. রাজনৈতিক রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা:আরবদের সিন্ধু বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত বিশৃংখল ও ত্রুটিপূর্ণ।হর্ষবর্ধন বিরাট রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেও তার মৃত্যুর পর রাজ্যের সর্বত্র যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় তা প্রায় পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। উত্তর ভারতের রাজনৈতিক এই বিশৃঙ্খলা মুসলিম বিজেতাগণকে রাজ্য জয়ে উৎসাহী হন।
৫. কেন্দ্রীয় শক্তির অভাব: আর মুসলিম যুগে ভারতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যে কেন্দ্র সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পন্ন সাহসের অভাবে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও কলা বিবাদ তীব্র থেকে তীব্র আকার ধারণ করে। এই এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে এসব রাজ্যের শাসক দুর্বল হয়ে পড়েছিল। যার ফলে মুসলমানদের আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
৬. বিভিন্ন রাজবংশের উদ্ভব:মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতবর্ষে বিভিন্ন রাজবংশের উদ্ভব ঘটে। এসব রাজবংশ ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের পোষণ করতো। তাছাড়া তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, বিচক্ষণতার অপূর্ণতা, ক্ষমতার লোভ বিলাসিতা প্রভৃতির অনুপ্রবেশ ঘটে ছিল। যার কারণে তখন বিদেশি শাসনের শুরু হয়।
৭. বৌদ্ধদের উপর নির্যাতন: সেসময় উত্তর ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজমান ছিল বলে মনে হয় না। কারণ ওই সময় শাসকরা ছিল ব্রাহ্মণ গোত্রীয়। তখন বৌদ্ধধর্ম অনুসারীরা নির্যাতিত হতো। তাদেরকে ভদ্র ধর্ম পালন করতে বাধা দিতো।যার কারণে তারা তৎকালীন রাজা দাহিরের প্রতি সন্তুষ্ট ছিল না।
৮. জাতীয়তা বোধের অভাব: মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের মধ্যে জাতীয়তাবাদের অভাব ছিল। তারা সাধারণ জনগণকে জাতিতে বহুৎ উজ্জীবিত করার ক্ষেত্র কোন প্রচেষ্টা করেনি।ফলে নির্দেশে আরবদের দ্বারা আক্রান্ত হলেও তারা এর স্বাধীনতার টিকিয়ে রাখতে শাসকদেরও সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেনি।
৯. মুসলিম বিজেতাদের আমন্ত্রণ:উল্লেখিত পরিস্থিতিতে উত্তর ভারতের কতিপয় ক্ষুদ্র হিন্দু রাজ্যের রাজা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান রাজ্যের বিরুদ্ধে মুসলিম বিজেতাদেরকে আমন্ত্রণ জানায়।তাদের এই পারস্পরিক বিশৃঙ্খলা ও প্রতিহিংসার কারণে আরবদের সিন্ধু বিজয়ের পথ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।




0 Reviews