Read more »
শাহজাহানের রাজত্বকালকে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলা হয় কেন?
ভূমিকাঃ
সম্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র শাহজাদা খুররম ১৬২৮ সালে শাহজাহান উপাধি নিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেন। মুঘল স্থাপত্যের ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয় তার আমলে স্থাপত্য শিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। সুতরাং তার যুগকে স্থাপত্য শিল্পের স্বর্ণযুগ বলা যায়। পারস্য স্থাপত্য শিল্পের প্রভাবে নির্মিত শাহজাহানের অসংখ্য ইমারত কালের স্বাক্ষর বহন করে আছে। এইজন্য ঐতিহাসিকগণ শাহজাহানকে The prince of builders of engineer King বলে অভিহিত করেছেন।
শাহজাহানের রাজত্বকাপকে মোঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলার কারণঃ
সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে মোঘল সাম্রাজ্যে সুশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্পকলা, স্থাপত্য প্রভৃষ্টি ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। এসব দিক বিবেচনা করে তার বাজত্বকালকে মোঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়।এ সম্পর্কে আলোচনা হলো-
১.) রাজ্য সম্প্রসারণ :
রাজ্য সম্প্রসারণ এবং মোঘল আধিপত্য বিস্তারে সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকাল বিশেষভাবে স্মরণীয়। তার শাসনামলে মোঘল সাম্রাজ্য বাংলাদেশের সিলেট হতে সিন্ধুদেশ এবং আফগানিস্তানের বিসত দুর্গ হতে দক্ষিণে ভারতবর্ষের অনুস্রা অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ প্রসঙ্গে ড. স্মিথ বলেন, শাহজাহানের রাজত্বকালে মোঘল বাংশ ও সাম্রাজ্য গৌরবের চরম শিখরে আরোহণ করে।
২.) সুষ্ঠু শাসননীতিঃ
প্রজারঞ্জক সম্রাট শাহজাহানের শাসনব্যবস্থার কাঠামো ছিল আকবরের শাসনব্যবস্থা অনুরূপ। কয়েকটি যুদ্ধ ব্যতীত তার ৩০ বছরের রাজত্বকালে সাম্রাজ্যের সর্বত্র সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজিত ছিল। তিনি প্রজাদেরকে রাজার মত শাসন না করে বরং পিতার মতই প্রতিপালন করতেন। ইতালীয়া পর্যটক তারা শাসনব্যবস্থার প্রশংসা করে বলেন, শাহজাহান সম্পূর্ণ দক্ষতার সাথে সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করছেন।
৩.) শিক্ষা সংস্কৃতির উন্নতিঃ
সম্রাট শাহজাহান শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি আরবি, ফার্সি ও হিন্দি ভাষায় সুপর্থিত ছিলেন। শিক্ষার প্রসারকল্পে সাম্রাজ্যের অসংখ্য বিদ্যালয় নির্মাণ করেন।এ ছাড়াও বিখ্যাত দার-উল-বাকা মাদ্রাসা এবং দিল্লির রাজ কলেজ নির্মাণ করে জনগণের শিক্ষালাভের পথ সুগম করেন। আবদুল হামিদ লাহোরী, আবদুল হাকিম শিয়ালকোটী, মুহিব আলী সৈয়দী, মীর আব্দুল কাশিম প্রমুখ মুসলিম কবি, সাহিত্যিক এবং হিন্দু কবি, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ তার রাজসভা অলংকৃত করেন।
৪.) সঙ্গীতবিদ্যার উন্নতিঃ
সম্রাট শাহজাহানের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় সঙ্গীত বিদ্যায় ও ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছিল। তার রাজদরবারে সঙ্গীতজ্ঞদের মধ্যে কবীন্দ্র, চিত্ৰখান, লালখাঁ গুণসমূদ্র ও জগন্নাথ ছিলেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । সম্রাট জগন্নাথকে মহাকবি জয়" উপাধিতে ভূষিত করেন।
স্থাপত্যশিল্পের উৎকর্ষসাধনঃ
স্থাপত্যশিল্পের উৎকর্ষসাধনে সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকাল ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। স্থাপত্যের রাজপুত্র' হিসাবে খ্যাত সম্রাট শাহজাহান জগদ্বিখ্যাত আগ্রার তাজমহল, সাত মসজিন, জামে মসজিদ, ময়ূর সিংহাসন, শীশমহল, অগ্রার খাস মহল, শাহজাহানাবাদ প্রভৃতি স্থাপত্যকীর্তি রেখে গেছেন। নিম্নে তার স্থাপত্যকীর্তি সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো-
(১) তাজমহলঃ
যমুনার তারে প্রিয়তমা পত্নী মমতাজ মহলের সমাধিসৌধ তাজমহল নামে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তা শুধু মুঘল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠত্বকেই প্রমাণ করে না, বরং যুগ যুগ ধরে দাম্পত্য প্রেমের একটি অবিস্মরণীয় প্রতীকরূপে সমাদৃত হয়ে আসছে। ১৬৩৩ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং বাইশ বছরে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়। এর প্রধান স্থপতি ছিলেন ওস্তাদ ঈশা খা। এর স্থাপত্যিক উপকরণের সুবিন্যাস, অলংকরণের সূক্ষ্মতা ও নৈপুণ্য দর্শকদের মুগ্ধ করে। একে "এক বিন্দু অশ্রু' ও 'মার্বেলের স্বপ্ন' বলে অভিহিত করা হয়।
স্মৃতিসৌধ সম্পর্কে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ বলেন-
এক বিন্দু নয়নের জলে
কালের কপোল তলে
শুভ্র সমুজ্জ্বল এ তাজমহল।
(২) নতুন নগর স্থাপনঃ
শাহজাহানাবাদ নামক নতুন নগর নির্মাণ তার অপূর্ব স্থাপত্য শিল্পানুরাগের পরিচয় বহন করে। ১৬৩৯ সালে তিনি শাহজাহানাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন। নতুন রাজধানী শাহজাহানাবাদ সম্পর্কে পার্গি ব্রাউন বলেন, মুঘল নগরীগুলোকে শ্বেত পাথরে মুড়ে দিয়ে গেছে। তাছাড়া দিল্লী, লাহোর, কাবুল, কান্দাহার প্রভৃতি স্থানে বহু সৌধ নির্মাণ করে তিনি রাজধানীকে সুসজ্জিত করে তোলেন।
(৩) দেওয়ান-ই-খাসঃ
শাহজাহানের স্থাপত্যানুরাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেওয়ান-ই-খাস। বহু মূল্যবান পাথরে খচিত দেওয়ান-ই-খাস নির্মাণ করে তিনি নিজেই মন্তব্য করেন। যদি পৃথিবীর কোথাও স্বর্গ থাকে তাহলে এই 'দেওয়ান-ই-খাস' তার যোগ্যতম স্থান।
(৪) ময়ূর সিংহাসনঃ
দেওয়ান-ই-খাসে স্থাপিত ময়ূর সিংহাসন নামে রাজকীয় সিংহাসন শাহজাহানের এক মূল্যবান কীর্তি। এটি ভারতীয় উনিশ কোটি মুদ্রা ব্যয়ে নির্মিত হয়। এটির দৈর্ঘ্য সোয়া তিন গজ, প্রস্থ আড়াই গজ এবং উচ্চতায় পাঁচ গজ ছিল। এ সিংহাসনের চারটি পা স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত ও বারোটি মরকত মণির স্তম্ভের উপর মণিমুক্তা খচিত চন্দ্রাতপ চাঁদ বসানো ছিল। প্রত্যেক স্তম্ভের মাথায় মণিমুক্তা খচিত একজোড়া ময়ুর মুখোমুখি বসানো ছিল। বর্তমানে ইংল্যান্ডের মহারাণী এই সিংহাসনটিতে উপবেশন করে থাকেন।
৫.) দিল্লীর জামে মসজিদঃ
শাহজাহান নির্মিত একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হল দিল্লীর জামে মসজিদ। পাঁচ বছর সময়ে নির্মিত হয় মসজিদটি এই মসজিদটি তার স্থাপত্য সৌন্দর্যের স্বাক্ষর বহন করে।
৬.) শালিমারবাগঃ
১৬৩৭ সালে শাহজাহান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত লাহোরের শালিমারবাগ আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে। শাহজাহান লাহোর অবস্থানকালে এই উদ্যানে অবস্থান করতেন।
৭.) মতি মসজিদঃ
আগ্রা দুর্গের নিকট শ্বেতপাথরে নির্মিত মতি মসজিন আজও দর্শকদের বিস্ময় করে। এ মসজিদ পৃথিবীর আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। এ মসজিদের আয়তন দৈর্ঘ্যে ২৩৪ ফুট এবং প্রস্থে ১৮৭ ফুট। এর নির্মাণ কার্যে খরচ হয় প্রায় ত্রিশ লক্ষ মুদ্রা।
৮.) মুসাম্মুম বুরুজঃ
আগ্রা দুর্গের অভ্যন্তরে তিনি অপূর্ব সুন্দর মুসাম্মম বুরুজ নামে একটি প্রকোষ্ঠ তৈরী করেন এই মুসাম্মম বুড়ো হয়ে তাজমহলের দিকে তাকিয়ে শাহজাহান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ
(৯) শিশমহলঃ
বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সুশোভিত রাজকীয় এই আবাসগৃহটি শাহজাহান নির্মাণ করেন ১৬৩১ সালে। অপঙ্কপ কারুকার্য খচিত শিশমহলের সৌন্দর্য সম্রাটের উন্নত রুচির পরিচয় বহন করে।
(১০) শাহজাহানাবাদঃ
সম্রাট শাহজাহান ১৬৩৯ সালে দিল্লীতে নূতন শহর শাহজাহানাবাদ-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। দেশ-বিদেশের বহু শিল্পী ও স্থপতি সুন্দর সুন্দর ও নয়নাভিরাম সৌধ ও অট্টালিকা নির্মাণ করে রাজধানীকে সুসজ্জিত করেন। ১৬৪৮ সালে সম্রাট শাহজাহান মহাসমারোহে এর উদ্বোধন করেন।
(১১) লাল কেল্লাঃ
শাহজাহান রাজধানী দিল্লীতে লাল কেল্লা নির্মাণ করেন। লাল কেল্লার অভ্যন্তরে দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস এবং মমতাজ মহল নামক প্রাসাদ অবস্থিত। শাহজাহান নির্মিত যে কোন প্রাসাদ অপেক্ষা দেওয়ান-ই-খাস অধিক সৌন্দর্যমণ্ডিত। এ প্রাসাদটি সর্বাধিক অলঙ্কারে সুশোভিত ছিল। এর প্রবেশ পথে ফারসি ভাষায় লিখা ছিল।
স্বর্গ যদি ধরা মাঝে থাকে কোন খানে
তা এই মানে, এই খানে, এই খানে।”
শাহজাহানের চরিত্রঃ
সম্রাট শাহজাহানের চরিত্রে নানা গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। নিম্নে তার চরিত্রের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরা হলো-
(১) নিষ্ঠুরতাঃ
শাহজাহান ছিলেন অত্যাচারী ও নিষ্ঠুর শাসক। তিনি সিংহাসন লাভের জন্য নৃশংস হত্যাকান্ড চালাতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। পর্তুগীজদের প্রতি নির্মম ব্যবহার, পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, প্রতিদ্ব হত্যা প্রভৃতি নিঃসন্দেহে সম্রাটের চরিত্রের নিষ্ঠুরতা লক্ষ করা যায়।
(২) স্নেহ -মমতাঃ
সম্রাট শাহজাহানের চরিত্রে স্নেহ ও মমতার পরিচয়ও পাওয়া যায়। তিনি পুত্রদের অত্যধিক স্নেহ করতেন। এছাড়া প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের নামে তাজমহল নির্মাণ করে তিনি ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেন।
(৩)জাঁকজমক প্রিয়ঃ
শাহজাহান জাকজমকপূর্ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি সৌন্দর্যপ্রিয় সম্রাট হিসেবে মোঘল ইতিহাসে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি দরবানা এবং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থান জাঁকজমকভাবে পরিপূর্ণ করেন।
(৪) উদারতাঃ
সম্রাট শাহাহানের চরিত্রে উদারতা লক্ষ করা যায়। তিনি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য সরকারি গুদাম খুলে দেন। তাছাড়াও তিনি সাত লক্ষ টাকার রাজত্ব মওকুফ করেন।
(৫) সাহিত্যানুরাগীঃ
সম্রাট শাহজাহান শিক্ষা ও সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। তিনি আরবি, ফার্সি ও হিন্দি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তার রাজত্বকালে অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক, সঙ্গীতশিল্পী উদার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।
উপসংহার:
রঃউপযুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, শাহজাহানের রাজত্বকালে মোঘল সাম্রাজ্য গৌরবের স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করে। এ সময় মুগল সাম্রাজ্যের সর্বত্র সুখ-সমৃদ্ধি বিরাজিত ছিল। তবে ঐতিহাসিকগণ তাকে নিষ্ঠুর, বিশ্বাসী, অত্যাচারী হিসাবে আখ্যায়িত করলেও তিনি ইতিহাসে নে সম্রাট হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।




0 Reviews